পাহাড় চূড়ায় সৌন্দর্যে ভরা এক হিমেল ঠিকানা লাভা

সেখানে সাড়ে চার হাজার রুপিতে একটা টাটা সুমো জিপ ভাড়া করে রওনা হলাম লাভার উদ্দেশে। শিলিগুড়ি থেকে সেবক ব্রিজ পেরিয়ে ডামডিম-গরুবাথান হয়ে আমরা লাভার পথে যাত্রা শুরু করি। শিলিগুড়ি থেকে লাভার দূরত্ব ১০০ কিলোমিটারের মতো। গাড়ি ভাড়া করে এ পথে সময় লাগে সাড়ে তিন ঘণ্টা। প্রায় সাত হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত লাভার নৈসর্গিক শোভা নাকি অতুলনীয়।

আমরা সকাল ৯টায় শিলিগুড়ি মোড় থেকে যাত্রা শুরু করি। চলতে চলতে পাহাড়ি রাস্তার ইউটার্নের মতো বাঁক পড়ে। এরই একটা বাঁক পেরিয়েই টাইগার ব্রিজ। স্থানীয়ভাবে সেবক ব্রিজ নামেও পরিচিত। সেবক নাম কেন জানা হয়নি, তবে ব্রিজ পেরিয়ে রাস্তার দুইপাশ জুড়ে মানুষের সেবা নেওয়ার জন্য বসে থাকা বানরের দল সঙ্গ দিলো অনেকটা দূর। একপাশে উঁচু পাথুরে পাহাড়, গাছ। একপাশে খাঁদ। সঙ্গে দেখা দুই বাংলার অতি পরিচিত নদী তিস্তা।

ব্রিজটি তিস্তার ওপরেই। নদীতে পানি নয়, দেখা গেলো শুধু পাথুরে ধারা। মনটা একটু খারাপই হলো। আমরা এই ব্রিজে দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম। বড় উঁচু পাহাড়ে চড়া শুরু হলো ব্রিজ পেরিয়েই। ব্রিজটি দার্জিলিংকে যুক্ত করেছে জলপাইগুড়ি জেলার সঙ্গে। উত্তর-পূর্ব দিকে গরুবাথান হয়েই পৌঁছাতে হবে লাভা। গরুবাথান সংরক্ষিত বন। বড় বড় শাল-সেগুন দেখা মিলল বনে। ভেতর দিয়ে মসৃণ রাস্তা চলে গেছে টানেলের মতো। বনে চরা গরু দেখা মিললো ক্ষণে ক্ষণে। গলায় আবার ঘণ্টি বাঁধা। গরুবাথানের অনেকটা আবার সেনাবাহিনীর দখলে। মাঝে-মধ্যে রয়েছে সমতলের সবুজ চা বাগান। পাহাড়ের ঢালে অসাধারণ সুন্দর সেই সব বিশাল চা-বাগান।মসৃণ পিচঢালা রাস্তায় গাড়ি ছুটছিল বেলাগাম ঘোড়ার মতো। মাঝে পড়ে নাগরাকাটার ভয়ানক জঙ্গল। লাভার রাস্তা খুব ভয়ানক, আর সেই সাথে নিচে গভীর খাদ। লাভা যাওয়ার পথে অনেকগুলো মাইলস্টোন আমাদের পার হতে হয়। পার হতে অনেক ছোট ছোট জনপদ। ছোট ছোট পাহাড়ি জনপথগুলো অনেক না জানা কথা গুটিয়ে রাখে ওদের অনাহূত খেলনা ঘরে। সেরকম অনেক কিছুই ভেসে উঠছিল আমাদের চোখের ধূসর আলোয়।

আমরা এগিয়ে চললাম সাপের মতো রাস্তা ধরে। গাড়ির থেকে গভীর খাদগুলো দেখছিলাম। ওরা যেন সবাই মিলে হাতছানি দিচ্ছিল। নীচে কোনো একটা নদী বয়ে যাচ্ছিল। আসলে এখানে ওই একটি নদীই অনেক নাম নিয়ে বয়ে গেছে। তাই আসলে যে কোন জায়গার কোন নাম তা বোঝা বেশ মুশকিল। নীচের বাড়িঘরগুলো পিঁপড়ের মতো লাগছিল। প্রায় ঘণ্টাদেড়েক চলার পথে শুরু হলো পাহাড়ি রাস্তা। পাহাড়ি রাস্তার বিবরণ দেওয়ার মানে হয় না। পাহাড় আর খাদকে কখনও ডানদিকে আর কখনও বাঁদিকে রেখে আমরা এগিয়ে চললাম।

আমাদের চলার পথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চোখজুড়ানো। চারপাশে শুধু চায়ের বাগান, মাঝে মাঝে বয়ে চলেছে ঝরনা, চা-বাগানের মাঝে একটা-দু’টো মাথা উঁচু করে থাকা গাছ, দূরে সবুজ পাহাড়, নীল আকাশ। ঠিক যেন ছবি৷মাঝে মাঝে চোখে পড়ে পাহাড়ের গায়ে নির্জন, নিরিবিলি ছোট্ট গ্রাম৷চারপাশে শুধুই মেঘে ঢাকা পাহাড়, ঘন ঝাউয়ের জঙ্গল, বয়ে চলা ঝরনা, আর রং-বেরঙের ফুল৷ ক্ষণে ক্ষণে প্রকৃতির রূপ পরিবর্তন, কখনও ঘন কালো মেঘ, কখনও আবার হালকা রোদ৷ জঙ্গল পেরিয়ে হালকা শীতে পাহাড়ের নির্জনতা মনটাকে উদাস করে দেয়।এখানে এলে পাইন গাছের প্রেমে পড়তেই হবে। ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন বিদেশী সিনেমায় কিংবা নতুন বছরের উপহার পাওয়া ক্যালেন্ডারের পৃষ্ঠায় পাইন গাছের ছবি দেখেছি। কিন্তু লাভা ঘুরতে এসে সামনাসামনি অসংখ্য পাইনের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রেমেই পড়ে গেছি। শিলিগুড়ি থেকে লাভা। যাত্রাপথের দৃশ্যাবলি অসাধারণ। সত্যি বলতে কী লাভায় কী কী দেখার আছে সেই বিষয়ে আমাদের ধারণা নগণ্য। মূলত শিলিগুড়ি থেকে লাভার যাত্রাপথের সৌন্দর্য দর্শনের নিমিত্তেই আমাদের আজকের ভ্রমণ এবং সেই ভ্রমণের আনন্দ কড়ায়-গণ্ডায় উসুল করেছি।

চারপাশে তাকালে মুগ্ধতায় দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এত সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য যা বর্ণনাতীত। একটা খরস্রোতা পাহাড়ি পাথুরে নদী তীব্র বেগে অজানা গন্তব্যে ছুটে চলছে। যেদিক থেকে নদীটার আগমন সেদিকে মুখ ব্যাদান করে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য পাহাড়। পাহাড়গুলোর একটার পিছনে আরেকটা দাঁড়িয়ে যেন এক সিঁড়ি তৈরি করেছে যা বেয়ে স্বর্গে চলে যাওয়া যাবে। আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা বা ধূসর মেঘ, শীতের চাঁদরে ঢাকা অপূর্ব নিসর্গ।

চলার পথে দেখেছি অসীম নির্জনতা। মানুষের অভাবে এখনও এখানকার প্রকৃতির কৌমার্য অক্ষত। তার সৌন্দর্য ভান্ডার অপরিসীম। এ অঞ্চলের আর এক অভিনবত্ব অদ্ভুত ধরনের বনস্পতি। ফার, পাইন, পপলার ও অন্যান্য গাছ দিয়ে ঢাকা তার ঢালগুলো। তারা যতো উঁচু ততো ঘন আর তেমনই মোটা তাদের গুঁড়ি। গাছগুলো যথেষ্ট লম্বা ও মোটাও বটে। সেই ঘন সবুজ পাহাড়ি বনানী দিয়ে ঘেরা লাভার যাত্রাপথ। হাওয়ার তোড়ে যখন ঘন বনস্পতির চামরে সবুজের ঢেউ খেলে যাচ্ছিল, তখন অপূর্ব লাগছিল।

রাস্তার কিছু অংশ বেশ খারাপ অথচ পথের দু ধারে সৌন্দর্য অবিরাম। একদিকে সবসময় পাহাড় আর আরেক দিকে খাঁদ। কিন্তু দু’দিকেই বেশ একটা জঙ্গল-জঙ্গল ভাব। গাড়ির জানালা দিয়ে আসা মিঠে রোদ গায়ে মেখে আচমকা ঢুকে পড়তে হয় এক অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে; গগণচুম্বী শতাব্দী প্রাচীন গাছের আড়ালে চলে যায় সূর্য আর গায়ের উপর এসে পড়ে মস ফার্ণের ঝোপ। সোঁদা গন্ধ বার বার নিয়ে যাচ্ছে আদিম কোনো দুনিয়ায়। এভাবে প্রায় চার ঘণ্টা চলার পর আমরা লাভা পৌঁছাই। এটা আসলে একটা পাহাড়ি গ্রাম। প্রায় সাত হাজার ফুট উচ্চতায় নিঃসঙ্গ এই গ্রামের বাজারের কাছে আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। সরু রাস্তার দু’দিকে নানা রকম দোকান, একটু উপরে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড, সেখানে বসার বেঞ্চি। অনেকটা ইউরোপীয় ধাঁচে বসানো হয়েছে। গ্রামের প্রাণকেন্দ্র বলা চলে। তিনমুখী এই রাস্তার একটা নিচের দিকে চলে গেছে। যার শেষ মাথায় লাভা মনাস্ট্রি। মোহগ্রস্তের মতো পা বাড়ালাম সেদিকে। সরু ঢালু পথ বেয়ে চলে এলাম শেষ মাথায়। পাইনের ফাঁক গলে দেখা যাচ্ছে লাল দালানটির চারপাশ। ঢোকার বিশাল দরজা।

পাহারের ঢালে বানানো খুব সুন্দর আর শান্ত পরিবেশ। হাঁটা পথে মনাস্ট্রির পিছন দিকে চলেছি। চোখ জুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্য। শুধু মনোরম পরিবেশই নয় স্থাপত্যেও সুন্দর এই মনাস্ট্রির। উপরি পাওনা চমৎকার ফুলের বাগান। ঢুকে গেলাম অদেখা দুনিয়ায়। হাড় কাঁপানো বাতাস ঠাণ্ডায় এখানে দু’দণ্ড দাড়িয়ে থাকা মুশকিল। মেঘ এখানে পায়ে পায়ে বাড়ি দিচ্ছে ক্লান্তিহীন। শীতে জবুথবু হয়ে আমরা নিরিবিলি নিসঃঙ্গ লাভাকে দেখি অবাক চোখে। লাভা দেখতে সুন্দর লাগে, সবুজ পাহাড়ি শিখরে বসানো মুকুটের মতো। চাপ, চিমল, ক্রিপটোমারোয়া প্রভৃতি বনজ ফুলদের সাথে নানাধর্মী ক্যাকটাস ও অর্কিড লাভার সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তুলেছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে লাভার উচ্চতা ও সূচালোমুখী গঠন আয়তনের কারণে বাতাসের চাপ এখানে অপেক্ষাকৃত কম। ফলে মেঘের দল প্রায়শই থাকে হাতের নাগালে। কখনও কখনও পা ভেদ করে যায়। লাভাকে এক কথায় মেঘরাজ্য বা মেঘকন্যাও বলা যায়।
লাভার সৌন্দর্য নিয়ে কোনও কথাই বোধ হয় যথেষ্ট নয়। তুষারময় শৃঙ্গ থেকে সবুজ পাহাড়ের প্রশান্তি, এ এক সুন্দরের সাম্রাজ্য। এর সৌন্দর্যের বৈচিত্র্য অঢেল।

গাঢ় সবুজ পাইন, লাল রডোডেনড্রন, সাদা ম্যাগনোলিয়া, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা ঝরনা, সবুজ বনাঞ্চল, মাটিতে এসে পড়া মেঘরাজি-সব মিলিয়ে লাভাকে পাহাড়ের রানি করে তুলেছে। আর মনাস্ট্রিটা যেন এই রানির মাথার মুকুট। পাহাড়ের মাথায় মুকুটের মতো সৌন্দর্যে ভরপুর এক হিমেল ঠিকানা লাভা। নেওড়াভ্যালি জাতীয় উদ্যানের উদ্ধত পাইনের বন এসে মিশেছে পাহাড়ের ঢালে। আর তারই মাঝে মাঝে সারি সারি বাক্সবন্দি বাড়ি।শীত-কুয়াশায় টিকতে না পেরে আমরা দ্রুত লাভা মনাস্ট্রির কাছে একটি ছোট্ট হোটেলে দুপুরের খাবার খেয়ে রওনা হই পাহাড়ের কোলে সবুজ গালিচা মোড়া ডেলোতে। লাভা থেকে কালিম্পংয়ের রাস্তায় ডেলো। দু’পাশে ঘাসের সবুজ গালিচা সদৃশ ক্ষুদ্র প্রান্তর মাঝে সাপের মতো লকলকিয়ে উঠে গেছে পিচ ঢালা মসৃণ কালো রাস্তা।

এর দু’দিকে রক্ষীর মতো দাঁড়িয়ে আছে ডেলো পাহাড় ও দুরপিন পাহাড়। এখান থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। যদিও অধিক কুয়াশার কারণে আমরা কাঞ্চনজঙ্ঘার মোহিত রূপ থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এর পাশ দিয়ে আপন খেয়ালে বয়ে চলেছে তিস্তা নদী। ভারত সরকার ডেলোকে নেচার পার্ক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। প্রকৃতির আদিম সৌন্দর্য আজও এখানে অটুট। ডেলো থেকে ছয় কি.মি. দূরে কালিম্পং শহর। এখানকার অন্যতম আকর্ষণ বাগান, ঝরণা, হনুমানজীর বিশালাকার মূর্তি।

পথে আমরা দেখি হনুমান মন্দির। পাহাড়ের শীর্ষে স্থাপিত পঁচিশ থেকে ত্রিশ ফুট উঁচু ধাতব কাঠামোর লাল রংয়ের হনুমান দেবতার জন্য বিখ্যাত স্থানটি। হনুমান দেবতার স্থাপনার ঠিক সম্মুখে ডান দিকে দেবী দূর্গার একটি ছোট্ট মন্দির রয়েছে। পর্বতের শান্ত পরিবেশ, পাইন বনের মৌনতা আর ভক্তদের আনাগোনা জগতের সৃষ্টি রহস্য ও পার্থিব জীবনের অসারতা সম্পর্কে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে!

পথের ধারে আমরা প্যারাগ্লাইডিং, রিভার রাফটিং, ট্রেকিং, হাইকিং প্রভৃতির জন্যও বিজ্ঞাপন দেখলাম। কালিম্পং ছাড়া ভারতের আর কোনো শহরে সম্ভবত প্যারাগ্লাইডিং এর সুযোগ নেই। এরপর আমরা প্রবেশ করি ডেলো পার্কে। ডেলো জলাধারের পাশেই এক সাজানো পার্ক। রয়েছে বসার চেয়ার। রঙিন ফুল ফুটে আছে চারপাশের টিলার ধাপে ধাপে। সেখানে ছবি তুলে আমরা কফি পান করে ফেরার প্রস্তুতি নিই। 

আমাদের জিপ চলতে শুরু করে। আমরা কারিম্পং হয়ে শিলিগুড়ি পৌঁছাব। তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। চলন্ত জিপে জানালার ধারে বসে দেখলাম মেঘেদের ভিড়, জ্যোৎস্নার আভাস, অবতল চাঁদের ছেঁড়া ছেঁড়া জ্যোৎস্না। আমাদের জিপ সব সৌন্দর্যকে রাত্রির আঁধারে ঢেকে দিয়ে এগিয়ে চলেছে শিলিগুড়ির দিকে। ফিরতে ফিরতে মনটা বিষণ্ণ লাগছিল।

তিন দিন ধরে অনেক কিছুই দেখলাম দার্জিলিংয়ে। আবার বাকি রইল অনেক কিছুই। তবে এই তিন দিনে দার্জিলিং আমার এক্কেবারে মনের ভেতরে বসে গিয়েছে। সুযোগ পেলে অদূর ভবিষ্যতেই আবার আসব এখানে। পাহাড়ের রানিকে এই আশ্বাস দিয়েই নেমে চললাম শিলিগুড়ির দিকে।
– 

Related posts

Leave a Comment