দার্জিলিং ঘুরতে গিয়ে

ইচ্ছেটা অনেকদিনের, ঘুরতে যাবো দার্জিলিং ভারতের দ্বিতীয় ভূস্বর্গ। মেঘ, বরফের কোল ঘেঁষে আসা আর সাথে পাহাড়ের হাতছানি তো ছিলোই। সমস্যা খালি একটাই ভারতের ভিসাটা পাওয়া। খুব ঝামেলা হয় বাংলাদেশ থেকে ভিসা পেতে। যাই হউক প্রায় ৩ মাস আগেই ভিসার জন্য আবেদন করে রাখলাম। এবং শেষমেশ পেলামও। যাত্রার দিন ঠিক করলাম অক্টোবর ২০১৪ কোরবান ঈদের আগের দিন রাতে।

প্রথম রাতঃ
যথারীতি বাস ছাড়বে আরামবাগ থেকে। শ্যামলী এসি বাস ঈদের কারনে ১৭০০টাকা নিল এক একজনের ভাড়া একেবারে শিলিগুড়ি পর্যন্ত। আমি আর আমার বউ আমরা দুইজন সহ বাস ভর্তি মানুষ সবাই যাচ্ছে দার্জিলিং দেখতে কারন এই সময়টা দার্জিলিং বেড়ানোর সবচেয়ে ভালো সময়। বাস ছাড়ল নির্দিষ্ট সময়ে শ্যামলী, গাবতলী হয়ে যমুনা সেতু দিয়ে। মাঝরাতে থামল বগুড়ার কাছে ফুড ভিলেজ রেস্টুরেন্টে। রাতের খাবার খেয়ে শুরু করলাম আবার যাত্রা। এইবার বাস ননস্টপ চলবে একেবারে চেংরাবান্দা পর্যন্ত। এসি বাস আরাম করেই যাচ্ছি, সুপারভাইজারের কাছ থেকে একটা কম্বল চেয়ে নিলাম। বাস দিলাম ঘুম একেবারে ঘুম ভাঙ্গল যখন আমরা তিস্তা ব্যারেজে। ভোর হয় হয় এমন সময় খুব সুন্দর ব্যারেজটা। ওখানে একটা গেইট খুলে দিতে হয় বাস যাবার জন্য। সকালের আধো আলোতে বেশ সুন্দর লাগছিল এই তিস্তা ব্যারেজকে। এর কিছুক্ষণ বাদেই আমাদের বাসের সুপারভাইজর সবার কাছ থেকে ট্র্যাভেল ট্যাক্স, পাসপোর্ট আর বাস টিকিট নিয়ে নিলেন। আপনি চাইলে বাংলাদেশ থেকেই এই ট্যাক্স দিয়ে আসতে পারেন। খুব সম্ভবত সরকারী যে কোন ব্যাংকই এই ৫০০ টাকা ট্যাক্স গ্রহন করে।

প্রথম সকালঃ
ভোর ৫.৫০ এ আমরা পৌছালাম চেংরাবান্দা সীমান্তে শ্যামলী কাউন্টারে। ওপারে সীমান্তের কার্যক্রম শুরু হয় ৯ টার পর তাই খানিকটা এদিক ওদিক ঘুরে দেখতে পারেন এই সময়ে, হালকা চা নাস্তা খেয়ে নিতে পারেন। আর সকালের সূর্য উদয়টা দেখতে পাবেন বাংলাদেশ ভারত সীমান্তে দাঁড়িয়ে এই বা কম কিসে।  সকাল ৯টায় আমাদের ডাক পরলো আমাদের বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন পার হবার জন্য। পাসপোর্ট, ভিসা চেক করে ছার পেতে প্রায় ১০.৩০ বেজে গেল। একটা টিপস দেই, আপনি চাকুরী করলে অবশ্যই ছুটির কাগজ (এনওসি) নিয়ে যাবেন না হয় ঝামেলায় পরতে পারেন, দামী ক্যামেরার জন্য আলাদা করে ট্যাক্স দিতে হয়। এইবার ব্যাগে স্টিকার লাগিয়ে ওইপারে চলে গেলেন, একই রকম ভাবে সব কাগজপত্র চেক করে আপনাকে ছারতে ছারতে ১১ – ১২ টা বেজে যাবে। এতক্ষণে অনেক খিদা পেয়েছে নিশ্চয়ই? আসে পাসে ঘুরে খেয়ে নিতে পারেন রুটি, পরটা, ডিম, সবজি আর সাথে টাকা ভাঙ্গিয়ে রুপি করে নিন শ্যামলীর মানি এক্সচেঞ্জ থেকে বা আপনার সুবিধামত জায়গা থেকে। চাইলে একটা সিম কিনে নিতে পারেন কথা বলার জন্য, ইন্টারনেট ব্যবহার করার জন্য। এবার আপনাকে শ্যামলীর ভারতের একটা বাসে করে নিয়ে যাবে শিলিগুড়ি।
শিলিগুড়িঃ
সীমান্ত থেকে শিলিগুড়ি শহরে পৌছুতে লাগবে প্রায় ২ঘন্টা। এখানে আসার আগেই যদি প্লানটা করে ফেলেন ভালো হয়, কখন, কোথায়, কি করবেন? শিলিগুড়িতে পৌছাতে ২ টা থেকে ৩টা নাগাদ বেজে যাবে আর শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যেতে আরো প্রায় ২.৩০ ঘন্টা লাগবে। একটা ছোট টিপস দেই এখানে নেমেই বাংলাদেশে ফিরে যাবার জন্য টিকিটটা কেটে ফেলুন, ফেরত যেহেতু যেতেই হবে। এবার নিজেরাই ঠিক করে নিন সেদিনই যাবেন না পরদিন। চাইলে সেদিনই রওনা করতে পারেন শিলিগুড়ি বাস/ জীপ স্ট্যান্ড থেকে যদি টাকা বাচানোর ইচ্ছে থাকে। ৮ জন থেকে ১০ জন বসা যায় এক একটা জীপে। রিজার্ভ করার দরকার নাই ১১০ – ১২০ টাকা করে নেবে এক একজনের টিকিট। নামিয়ে দেবে একেবারে দার্জিলিং টাউনহল। বাস ব্যাগ, বোস্কা চাপিয়ে দিন জীপের ছাদে। চাইলে আপনি আরেক ভাবেও যেতে পারেন দার্জিলিং। শিলিগুড়ি ষ্টেশন থেকে দার্জিলিং ট্রয় ট্রেন ছাড়ে দিনে খুব সম্ভবত দুইবার। সবচেয়ে ভালো হয় যদি ট্রেনের টিকিট কেটে নিতে পারেন তাহলে জীবনের খুব সুন্দর একটা ভ্রমনের সাক্ষী হতে পারবেন। চার পাশের প্রকিতির অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে, এ এক অপূর্ব ভ্রমণ যা সারাজীবন মনে থাকবে। আশা করি সন্ধ্যার মধ্যেই দার্জিলিং পৌছে যাবেন। এবার হলো হোটেল ঠিক করার পালা। অক্টোবর থেকে পর্যটকের আনাগোনা বাড়ে। অতএব আগে থেকে হোটেল বুক করতে পারেন বা চাইলে সেখানে গিয়েও খুঁজে নিতে পারেন। তবে মনে রাখবেন দার্জিলিং এ ঘুমটা খুব দরকার, পাহাড়ি শহর কখন উঁচুতে উঠতে হবে কখনো নিচুতে নামতে হবে মেলা ধকল যাবে শরীরের উপর তাই একটা ভালো মানের হোটেল বুক করাই ভালো, সাথে জেনে নেবেন পানি গরম যন্ত্র ঠিক আছে কিনা। যাই হউক এতক্ষণে সব হলো খেতে হবে এখন, চলে যান সোজা কেভেন্টারসে – টাউন হলের গেইটের মুখে দোতালায় খোলা আকাশের নিচে বসে খেয়ে নিতে পারেন হালকা বা একেবারে রতের খাবার। দেশি খাবার খেতে চাইলে এর পাশেই আছে হোটেল চাণক্য আর আরো গোটা কয়েক খাবারের হোটেল। খাবার শেষ হলে ভালো শক্তি অর্জন হলো হেঁটে হেঁটে চলে যান দার্জিলিং ম্যালে। ঘন্টাখানিক  কাটিয়ে আসুন মেঘ পাহাড়ের কাছাকাছি। এবার খুব করে ঘুমিয়ে নিন আর ঘুমুতে যাবার আগে হোটেলের ম্যানেজারকে বলে রাখুন কাল সকালে টাইগার হিলে সূর্য উদয় দেখতে যাবেন। এখানে একটা ব্যাপার আছে শুধু টাইগার হিল ও দেখতে পারেন আবার চাইলে সাথে আরো কয়েকটা স্থানও দেখতে পারেন সাথে। তারা বলে ৭ স্পট, ৫ স্পট, ৩ স্পট, কথা বলে আর সময় হিসেব করে দু তিনজন হলে একটা শেয়ারিং প্যাকেজ বুক করে নিন বা বেশি লোক হলে পুরো একটা প্যাকেজ নিয়ে নিন আসলে সবই টাকা বাঁচানোর জন্য।

দ্বিতীয় দিনঃ 
টাইগার হিলঃ
খুব ভোরে (৪ – ৪.৩০) হোটেলের লোক বা প্যাকেজের লোকজন এসে ডেকে দিবে বের হবার জন্য। এবার গন্তব্য টাইগার হিল, যদি কপাল ভালো থাকে তবে সূর্যদয় দেখতে পাবেন কারন অনেকে না অনেকবার গিয়েও  সূর্যদয় দেখতে পারে না কুযাশার জন্য। তবে দেখতে যদি পান সারা জীবন মনে রাখবেন, এ এক নতুন সূর্যদয় দেখবেন। কাঞ্চনজঙ্গা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে যখন সূর্য উঠবে তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারবেন না। সাদা বরফে ঢাকা পাহাড়ে রক্তিম সূর্যের খেলা পুরো পাহাড়কে লাল করে দেয়। অসম্ভব ঠাণ্ডা এখানে, দাঁড়িয়ে থাকাটাই কঠিন যদি গরম কিছু না নিয়ে যান। এখানে অনেকটা সময় কাটিয়ে গাড়ি আপনাকে নিয়ে যাবে পরের গন্তব্যে।

বাতাসিয়া লুপঃ
একটা পার্কের মত সুন্দর করে সাজানো, পাতাবাহার, ফুল আর সুরকির পথ, হাটার জন্য। তার চেয়ে বড় হলো এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্গা পাহাড় দেখা যায়, আশে পাশের আরো অনেকগুলো পাহাড়, ভোর বেলায় রোদের প্রতিবিম্বের কারনে এক মায়াময় ছবির মত লাগে। দার্জিলিং ট্রয় ট্রেন আবার এই বাতাসিয়া লুপ ঘুরে যায়, চাইলে পাহাড়ি পোষাক পড়ে ছবিও তুলতে পারবেন। এক কথায় খুব সুন্দর একটা জায়গা ২০টাকার টিকিট লাগে এইখানে ঢুকতে। লুপের গেইটের কাছে খুব স্বাদের পাকুরা, ছোলা, ভাজা, চা পাওয়া যায়, যদিও চা খুব একটা ভালো না।

ঘুম মনেষ্ট্রিঃ
এটি মূলত বৌধ্যদের একটা মন্দির, উঁচু একটা পাহাড়ে খুব সুন্দর কারুকার্য খচিত মন্দির।  যারা সেলফি তুলতে পছন্দ করেন এখান থেকে ভাল ভিউ পাবেন। উপর থেকে চারপাশের উঁচু উঁচু পাহাড় দেখে মুগ্ধ হয়ে যাবেন। এর পর গাড়ি শহরে চলে আসবে।

নাস্তা সেরে নিতে পারেন সবচেয়ে সুন্দর লোকেশনের হোটেল “কেভেন্টারসে” তিন রাস্তার মাথায় দোতলা খোলা ছাঁদে চারপাশে পাহাড়ে পাহাড়ে বরফ জমে আছে দূর থেকে যায় তার মাঝে বসে ধোয়া তোলা এককাপ চা ভাবতেই কি যে ভালো লাগে। ওদের সসেজ, মিট লোফ চা এইগুলো মিস করবেন না। নাস্তা সেরে নিয়ে আবার শুরু করুন যাত্রা।

পদ্মাজায়া জুলোজিকাল পার্কঃ
২০টাকা টিকিট কেটে ঢুকলাম খারাপ লাগবে না কথা দিলাম। খুব সুন্দর করে সাজানো এই চিড়িয়াখানা কাম পার্ক। অনেক পশুপাখি এবং আমাদের রয়েল বেঙ্গল টাইগারও খুঁজে পেলাম। অনেকটা সময় কাটাতে পারেন, আসেপাশে বসার ভালো বাবস্থা আছে।

চা বাগান ও ক্যাবল কারঃ 
এটি দেখার পর হয়ত আপনি হতাশ হবেন, কারন দার্জিলিং বলতে যে চা বাগান চোখের সামনে ভেসে উঠে এটি তা নয়। গাড়ি এসে থামবে কয়েকটা দোকানের সামনে। এখানে একটা মজার বিষয় আছে, আপনার গাড়ি যে দোকানের সামনে থামবে আপনাকে সে দোকান থেকেই চা কিনে খেতে হবে। অন্য দোকান থেকে চাইলেও তারা বিক্রি করবে না। তবে ঘটনা যাই হউক চা খেতে ভুল করবেন না খুব চমৎকার চা স্বাদ সম্পূর্ণ আলাদা। আর চাইলে কিছু তাজা চা পাতা কিনে নিতে পারেন এখান থেকে। এই ছোট ছোট দোকান গুলোর পেছনের দিকে আপনি খুঁজে পাবেন চা বাগান। খুব বেশি আহামরি কিছুনা। তবে আবার খারাপও না। যাই হউক শেষ করলাম চা বাগানের পালা। এবার চলল গাড়ি আমাদের কে নিয়ে ক্যাবল কারের দিকে এই সব গুলোই একই পথে পড়ে তাই গাড়ি আপনাকে ক্রম অনুসারে নিয়ে যাবে। আমরা ক্যাবল কারে চড়িনি। আসলে আগে ভাগে যেতে হয় টিকিট কাটার জন্য। অনেকটা সময় লেগে যায় লাইনে দাঁড়িয়ে আপনার নম্বর আসা পর্যন্ত। ২৫০টাকা ছিল টিকিট এখন হয়ত বাড়তে পারে। এবার সরাসরি চলে গেলাম দার্জিলিং শহরে আসলে পেট ততোক্ষণে জানান দিচ্ছিল কিছু একটা খাবার দরকার। বেলা ৩টা বাজে তখন, আমরা নামলাম টাউনহল তার পাশেই কেভেন্টারস আর বাংলা হোটেলের জন্য বেশ ভালো চাণক্য হোটেল আছে, মনে মনে ভাবছিলাম অনেকটা সময়তো না খেয়ে আছি বাংলা খাবার হলে মন্দ হতো না। তাই পেট পুড়ে খাবার জন্য ঢুকে গেলাম চাণক্য হোটেলে। বেশ ভাল ছিল খাবার স্বাদ একেবারে বাঙ্গালীদের মত রান্না। শেষ করলাম দ্বিতীয় দিনের ভ্রমণ। হোটেলে ফিরে ফ্রেস হয়ে একটু রেষ্ট করে নিলাম। আসলে পাহাড়ি পথ একমাত্র বাহন জীপ বা কার আর শহরটা ছোট হবার কারনে আপনাকে পায়ে হেঁটেই বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন জায়গায় যেতে হবে। তাই ভারি খাবার আর বিশ্রাম বেশ দরকারি। মনে রাখবেন অক্টোবর থেকে বেশ ঠাণ্ডা পড়া শুরু হয় কিছু গরম কাপড় নিয়ে নিতে ভুলবেন না। রাত বাড়ার সাথে সাথে ঠাণ্ডা বেশ বাড়ে। টাইগার হিলে যাবার জন্য অবশ্যই আপনাকে ভারি গরম কাপড় নিতে হবে কারন অতো ভোর বেলা বেশ ঠাণ্ডা পড়ে।

দ্বিতীয় বিকাল, সন্ধ্যা আর রাতঃ
মহাকাল টেম্পল, দার্জিলিং মেল আর কেনাকাটাঃ

এবারে দারজিলিং’র একেবারে মাঝ খানে সেন্টার পয়েন্ট মেল’এ যাবার পালা। এখানে এলে আসলে ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ পাবেন একেবারে চুড়া থেকে দারজিলিং’র আসে পাশে দেখার। কপাল ভালো হলে মেল’এ মেঘ দেখতে পাবেন। মেল’র চারপাশ ছড়ানো বসার সুন্দর ব্যাবস্থা করা আছে। ক্লান্ত হয়ে গেলে বসতে পারবেন। একটা কফি শপ আছে “ক্যাফে কফি ডে” তাঁদের আবার আউটডোর এ বসার সুন্দর ব্যবস্থা আছে। এখানে বসে এক কাপ কফি খেতে ভুলবেন না। ভাগ্য ভালো থাকলে একটা অভিজ্ঞতা হয়ে যেতে পারে। আপনি কফি খাচ্ছেন আর আপনার চার পাশ জুড়ে মেঘ উড়ে বেড়াচ্ছে। আপনি মেঘের ভেতরে বসে কফি খাচ্ছেন। জানি ভেবেই আপনি শিহরিত হচ্ছেন। আমার কপাল ভালো এই সৌভাগ্যটুকু আমার হয়েছে। দারিজিলিং যাবার কিছু সার্থকতা খুঁজে পাবেন এটি তার মধ্যে একটি। যাই হউক কফি খেয়ে চলে গেলাম মহাকাল টেম্পল দেখতে। বেশ উঁচুতে অনেকটা পথ বেয়ে ঊঠতে হয়। বেশ সুন্দর হিন্দুদের একটা কালি মন্দির প্রচুর বাঁদর, কাঠবিড়ালি দেখলাম ঘুরে বেড়াচ্ছে। হিন্দুদের হলেও এটি কিন্তু টুরিস্টদের একটি ভালো গন্তব্য। মেল’র পাশেই আছে অনেকগুলো দোকান, এখান থেকে ভারতের সবচেয়ে দামি চা পাতা কিনে নিতে পারেন। শীতের ভাল জামা কাপড় ও পাবেন আর পাবেন সুস্বাদু খাবার “মম”। এখানকার কেএফসি দেখলাম বেশ সস্তা আমাদের দেশের তুলনায়। রাতের খাবার খেয়ে নিলাম কেএফসি থেকে। ভারতের পর্যটন খাত উন্নত হবার পেছনে আমার কাছে মনে হয়েছে ওরা দেশকে বেশ ভালোবাসে, তাছাড়া খুব একটা দালাল বা ভিক্ষুকের উৎপাত দেখলাম না যা অনেকটা স্বস্তিদায়ক। এভাবেই শেষ করলাম ব্যস্ত দ্বিতীয় দিন।

তৃতীয় দিন সকালঃ
রক গার্ডেনঃ

খুব সকালে বের হলাম একটু খানি শহর দেখতে হাঁটতে হাঁটতে খুঁজে পেলাম এক কলকাতার দাদাকে যে কিনা যেতে চায় রক গার্ডেন। আমি আর আমার বউ তাই ভাবলাম শেয়ারে গেলে টাকাও কিছু কম পড়বে। তাই দাদার সাথে কথা বলে জানলাম তারা মাত্র তিনজন। অতএব দুজনে মিলে একটা জিপ ভাড়া করে নিলাম ৮০০ টাকায়। আমি যেখানেই যাই ট্রিপ এ্যডভাইজরে টুকটাক খোজ লাগাই কোথায় কি দেখবো তা জানতে। দেখলাম রক গার্ডেন ছিল অবশ্য গন্তব্য দারজিলিং’র। শুরু করলাম যাত্রা আসলে এক দুঃসাহসিক যাত্রা আমি আমার জীবনে এমন ভয়ংকর খাড়া রাস্তা দেখিনি। গাড়ি যখন নিচে নামতে থাকে মনে হবে সামনে কিছু নেই। কত যে দক্ষ এই চালকরা তা আপনি নিজে না দেখলে বুঝতে পারবেন না। সত্যিই ভয়ংকর ৭০০০ ফিট উপর থেকে সোজা ৪০০০ ফিটে নেমে আসা, মাঝে মাঝে পাশের রাস্তার রেলিং ও নাই সব মিলিয়ে সত্যিই ভয়ংকর এক অভিজ্ঞতা। জীবনে ভুলবো না। এতো ভয়ংকর রাস্তায় কি যে অবলিলায় তারা গাড়ি চালিয়ে যায় চোখে না দেখলে কেউ বুঝতেই পারবেনা। আমার লেখা দিয়ে আমি প্রকাশ করতে পারছিনা আসলে যখন আপনি রক গার্ডেনের রাস্তায় নিচের দিকে নামবেন আর উপরে উঠবেন এটি সত্যিই এক অন্যরকম রক্তহিম করা অভিজ্ঞতা। যাই হউক দাঁত মুখ খিঁচে অবশেষে পৌছুলাম রক গার্ডেনে। সত্যিই প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি। অনেক উঁচু উঁচু গাছে ঘেরা বড় বড় দানব আকৃতির পাহাড়ের উপর থেকে একই গতির স্রোতধারা অবিরাম বয়ে চলছে। হিমেল জল আপনার প্রাণ জুড়িয়ে দেবে। ২ – ৩ ঘণ্টা ধরে খুব ভালো  সময় কাটাতে পারবেন। চমৎকার সব পাহাড়ি গাছ আর ফুল চোখে পড়বে।

দুপুর বেলা ফিরে আসলাম টাউনে, খাবার খেয়ে নিলাম পাশের একটা হোটেলে। খেয়ে চলে গেলাম হোটেলে একটু বিশ্রাম করতে। প্রায় সব কিছুই দেখা হয়ে গেছে টুকটাক যা বাকি আছে তা চাইলে এই সময়ে দেখে আসতে পারেন। আমরা কাঞ্চনঝঙ্গা যাই নি। চাইলে ঘুরে আসতে পারেন, তুষার দেখার ভাগ্যটা হয়ে যাবে।

দার্জিলিং ষ্টেশন ও ধীরধাম টেম্পলঃ
বিকালে বের হলাম যা কিছু বাকি আছে একটু ঘুরে দেখতে চলে গেলাম দার্জিলিং ষ্টেশনে অনেক বার শুনেছি এই ট্রয় ট্রেন আর দার্জিলিং ষ্টেশনের গল্প। মনে পড়ে গেল ম্যায় হুনা ছবির শাহরুখ খানের দৌড়ের দৃশ্য। আর যাদের গল্প পড়ার অভ্যাস আছে তাঁদের আসা করি বলে দিতে হবে না এই ষ্টেশন ঘিরে কত গল্প আছে। একটা কাজ করলাম পরের দিনের জন্য টিকিট কেটে ফেললাম দুইখান উদ্দেশ্য ঘুম ষ্টেশন যাবো ট্রেনে চড়ে আবার ফিরে আসবো তাতে করে পাহাড় আর সবুজের দেখা মিলবে, সাথে ৭০০০ ফিট উপড়ে ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতাও হবে। কিছু সুন্দর সময়ও পাওয়া যাবে। কথায় আছে কারো সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য বুঝতে হলে তাঁদের লোকাল যান বাহনে চড়তে হয়। নানান মানুষের সাথে পরিচয়, জানতে পারার একটা সুযোগ হয়ে যাবে। টিকিট কাঁটা শেষে চলে গেলাম ষ্টেশনের খুব কাছে আরেকটি মন্দির আছে “ধীরধাম টেম্পল”। সকাল বেলা এই টেম্পলে আসলে দেখতে পাবেন কাঞ্চনজঙ্গার উপরে বরফ আর সূর্যের খেলা, সোনালী রং ধারন করে যখন সূর্যের আলো কাঞ্চনজঙ্গার চুড়ায় পড়ে। অভূতপূর্ব দৃশ্য না দেখলে ভাষায় প্রকাশ সম্ভব নয়। আরো রাতের বেলা চলে গেলাম রিংক মল, ইন্ডিয়া আসলাম আর হিন্দি মুভি দেখবনা তা কি হয়? মুভি দেখে রাতের খাবার খেয়ে তারপর চললাম হোটেলে।

চতুর্থ দিনঃ
টিকিট কাটা আছে তাই সকাল সকাল বের হলাম ষ্টেশনের উদ্দেশ্যে যথা সময়ে ট্রেনে চেপে চলতে লাগলাম। আর একটু পর চোখের সামনে এক অপূর্ব প্রকৃতি ভেসে উঠতে লাগলো। আস্তে আস্তে নানান ধরনের দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠবে বাজি ধরে বলতে পারি এমন অনেক কিছুই দেখবেন যা আপনি আগে দেখেন নি। পৌঁছে গেলাম ঘুম ষ্টেশনে। খানিক এদিক ওদিক ঘুরে আবার ফিরে এলাম দার্জিলিং ততোক্ষণে দুপুর প্রায়। ভ্রমনে একটা জিনিস মনে রাখতে চেষ্টা করবেন, সবসময় যতটা সম্ভব স্বল্প সময়ে বাজেটের মধ্যে সবটুকু উপভোগ করার চেষ্টা করবেন। আর কোথাও যাবার আগে ভালো করে তথ্য সংগ্রহ করুন যেন মনে হয় আপনি আগেও একবার এসেছেন। এবার খোজ খবর লাগান যে কাছাকাছি কিছু বাদ পড়ে যাচ্ছে না তো গেলে হাতে যেহেতু সময় আছে ঘুরে আসুন আর তা না হলে বিকাল বেলা থেকে সন্ধ্যা অব্দি বসে থাকুন দার্জিলিং মেল’এ অনেক কিছুই  দেখতে পাবেন আর উপভোগ করতে পারবেন প্রকৃতির কাছাকাছি সত্যিকারের শীতকাল। একফাকে শিলিগুড়ি ফিরে যাবার গাড়ি ঠিক করে ফেলুন। ঠিক করতে বলছি এই কারনে যেন শিলিগুড়ি ফেরার সময় আপনি মিরিক হয়ে আসতে পারেন। তাতে করে দুটি লাভ হবে এক. পৃথিবী বিখ্যাত সব চায়ের বাগান দেখতে পাবেন, দুই. ভুটান যাবার পথটা ছুঁয়ে আসতে পারলেন আর সাথে মিরিক তো বোনাস।

পঞ্চম দিনঃ
মিরিক হয়ে শিলিগুরিঃ

সকালে নির্ধারিত সময়ে হোটেল ছেড়ে দিয়ে ঠিক করে রাখা জীপে করে রওনা হলাম মিরিকের উদ্দেশ্যে। গাড়ি ছাড়ার কিছুটা সময় পর থেকে বুঝতে পারলাম পৃথিবী কত সুন্দর, কি বিশাল বিশাল সব গাছ বুঝতে পারলাম সৃষ্টিকর্তা কি নিপুন হাতে বানিয়েছেন। না হয় এই বড় আকারের গাছ না হলে বিশাল আয়তনের পাহাড় গুলো টিকে থাকতে পারতো না। পাহাড় ধসে পড়তো। সুনসান নিরব সব রাস্তা পাহাড় কেটে বানানো, একটু পর পর মেঘ এসে ঢেকে দিয়ে যাচ্ছিল, ভিজিয়ে দিচ্ছিল গাড়ির গ্লাস। অনেকটা চলার পর আমরা এসে পৌছুলাম নেপাল যাবার এন্ট্রি পয়েন্টে, এখানে চাইলে ড্রাইভারকে বলে থামতে পারেন। সময় থাকলে ভিসা করে এখান থেকে নেপালও ঘুরে আসতে পারেন যেহেতু ওরা অন এ্যারাইভাল ভিসা দেয়। চলতে চলতে দেখা মিলল বিশ্বের নাম করা সব চা বাগান আর কি সুন্দর সাজানো গোছানো বাগান দেখেই মনে হবে ভেতরে ঘুরে আসতে। অনেকগুলো চা বাগান পাবেন চাইলে গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলতে পারেন। মেঘের ভেসে যাওয়া তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার আনন্দই অন্যরকম। দুপুর ১২টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম মিরিক। বিশাল এক প্রাকৃতিক লেক এতো উপরে এ এক অনন্য সৃষ্টি বিধাতার। অনেক বড় একটা লেক, চারপাশে পাহাড়ি সব গাছ। এখানে একটা মজার জিনিস পাবেন লেকের একটা জায়গায় একটা ছোট ব্রিজের মত আছে ওখানে দেখবেন হাজার হাজার মাছ (এত মাছ যে ওরা একে অপরের গায়ে লাফিয়ে উঠে অনেকদুর পর্যন্ত উঠে আসে) খাবারের জন্য লাফালাফি করছে মানুষ মুড়ি, পাউরুটি, বিস্কুট দিচ্ছে আর ওরা গোগ্রাসে গিলে খাচ্ছে। অনায়াসে ১-২ ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারবেন। যথাসময়ে আমাদের গাড়ি আবার চলতে শুরু করলো গন্তব্য শিলিগুড়ি। ইতিমধ্যে প্রায় ৪-৫ হাজার ফিট নীচে নেমে এসেছেন। আরো নামতে হবে তবে এখন আর ততো খাড়া পাহাড় পাবেন না। আস্তে আস্তে সমতলে মিলিয়ে যাবে। পথে কমলার বাগান পাবেন থামতে পারেন চাইলে, ওখানকার লোকজনকে বলে দু একটা নিতেও পারবেন। সব মিলিয়ে দারজিলিং থেকে শিলিগুড়ি আসার এই রাস্তাটাও অনেক সুন্দর। যাবার আর ফিরে আসার পথে দু রকমের স্বাদ পাবেন। সকালে রওনা দিলে মিরিক ঘুরে আসতে আসতে দুপুর ৩টা বেজে যাবে।

শিলিগুড়িঃ
রাতটা কাটাতে পারেন এদিক সেদিক ঘুরে। খুব বেশি কিছু নেই ঘুরে দেখার মত। তবুও দুইটা বড় মল আছে; সিটি সেন্টার আর কসমস শপিং মল, ভালো সময় কাটাতে পারবেন। কেনা কাটার জন্য বেশ সস্তা শিলিগুড়ি নিউ মার্কেট, বিগ বাজার আর কিছু মেয়েদের জামা কাপড়ের পাইকারি দোকান আছে ভালো জামা পাওয়া যায় অনেক কম দামে। এখানকার খাবার দাবার ও বেশ ভালো। শহরটাও বেশ ছিমছাম শান্ত।

ষষ্ঠ দিনঃ
এবার ফেরার পালা। টিকিটের দিনক্ষণ অনুযায়ী ফিরতি বাসে চেপে বসুন আর ফেরত আসার সময় প্রচন্ড মন খারাপ নিয়ে ফিরে আসুন।

তপু সৌমেন, ফ্রিল্যান্স লেখক, কবি

Related posts